রাজধানীর কলাবাগানের একটি ফ্ল্যাটে দিনের পর দিন বাথরুমে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় পাশবিক নির্যাতন করা হতো ফারজানা আক্তার নামে এক গৃহকর্মীকে। শুধু তাই নয়, মারধরের পর জখমে মরিচের গুঁড়াও লাগিয়ে দেওয়া হতো। শরীরের নানান জায়গায় জখমের যন্ত্রণা এবং পাশবিক নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে দিন পার করছেন ফারজানা।

জানা গেছে, রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন ফারজানা। ওই বাসার গৃহকর্ত্রী সামিয়া ইউসুফ ওরফে সুমির নির্মম নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফারজানা। তারপর ওই গৃহকর্ত্রী ভয় পেয়ে ১৭ জানুয়ারি ফারজানার বাবাকে ফোন দিলে তারা এসে ফারজানাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

১৫ বছরের ফারজানাকে দেখে মনে হবে রোগে শোকে কাতর বয়স্ক কোনো নারী। ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে হরহামেশা মারধর করা হতো। বাথরুমে আটকে, ঠান্ডা এবং গরম পানি ঢালা হতো শরীরে। মারধরের পর ক্ষতস্থানে মরিচ লাগিয়ে দিতো। শরীরের চামড়া থেঁতলে কালচে হয়ে গেছে। তবু থামেনি গৃহকর্ত্রী সামিয়া ইউসুফ ওরফে সুমির নির্মম নির্যাতন।

অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে চিকিৎসাধীন এ অসহায় মেয়েটির অভিযোগ, মারধরের সময় চিৎকার করলে বা কাউকে বললে তার মা-বাবাকে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হতো। তাই সে নীরবে সহ্য করত সব নির্যাতন।

ফারজানা আক্তার জানান, তারা আমার পুরো শরীরে মেরেছে। বাথরুমে হাত-পা বেঁধে সারা রাত আমাকে মেরেছে। আমি আপুকে বলেছি, আমি আর মার খেতে পারছি না। আমাকে আমার মায়ের কাছে দিয়ে দেন। এ কথা বলাতে আমাকে আরো বেশি মারধরের হুমকি দিত।

শুধু তাই নয়, ওই বাসায় থাকা ফারজানার ছোট বোনটিও মারধরের শিকার হয়েছেন।

মেয়েটির মা জ্যোৎস্না বেগম জানান, আমরা অসচ্ছল, তাই মেয়ে দুটির ভালোর জন্য অন্যের বাসায় কাজে পাঠাই। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কল্পনাতেও ভাবিনি।

এদিকে এ ঘটনায় গত ২০ জানুয়ারি ফারজানার বাবা মামলা দায়ের করেন। এরপর ওই গৃহকর্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানায় র‌্যাব।

র‌্যাব ২-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নাঈম মোহাম্মদ তালাত বলছেন, আমরা ফারজানার যাবতীয় খোঁজখবর রাখছি।

রাজধানীর হাজারীবাগে বসবাসরত অসহায় পরিবারটি এ ঘটনার জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

আসামিপক্ষের আইনজীবী সাজেদুল ইসলাম বলেন, এ মামলার বাদি প্রথম দিন আদালতে এসে বলেছেন, জামিন দিলে তার আপত্তি নেই। আর আসামির বিরুদ্ধে যে ধারার অভিযোগ করা হয়েছে এতেও কিছু তারতম্য আছে। এজাহারে বলা হয়েছে আগুন দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার কথা। কিন্তু মেডিকেল রিপোর্ট বলছে, তার সিস্টের সমস্যা আছে। ৩২৩, ৩২৪ ধারা জামিনযোগ্য। আর ৩২৬ ধারা মারাত্মক জখমের। মারাত্মক জখমের তো একটা ম্যাটার থাকতে হবে। সবকিছু বিবেচনা করে আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।

এদিক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ফারজানাকে ২০১৫ সালে মাসিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে সামিয়ার বাসায় কাজে দেয় পরিবার। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় ফারজানা পরিবারকে জানায়, সামিয়া তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। মারধর করে এবং খাবার দেয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *